নাটক বিনোদন

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রসেনজিৎ বর্ধন স্মরণে ‘গোবরডাঙ্গা কথাপ্রসঙ্গ’

বিশেষ প্রতিবেদন
রেল লাইনের ধারে গিয়ে দাড়ালে মনে হচ্ছিলো দুটি পাইথন এঁকে-বেঁকে ছুটে যাচ্ছিল কোনো এক অজানার খোঁজে, হঠাৎ কোনও এক মহা প্রলয়ে নিথর। রাজপথ গুলো যেনো মৃত শঙ্খচুড়। শহর যেনো প্রাগৈতিহাসিক। থমথমে, ফ্যাকাশে মায়ের কোলে বদমেজাজি শিশু, কর্মহীন শ্রমিকের ঘোলাটে চোখ, অনাহারে ক্লান্ত শিল্পীর চোখে জোছনা যেনো কাফন। ভয় পেতে পেতে মস্তিষ্ক যখন অসংলগ্ন প্রায়, তখন কারা যেনো ভয় দেখানোর খেলায় মেতে উঠেছে। করোনা কালের ঠিক এমনি সময় ঠিক হলো “ভয় কে করতে হবে জয়”। এই হতাশা থেকে মুক্তি দিতে পারে আমাদের প্রাণের “রবীন্দ্রনাথ “‌।
রবিঠাকুরের ছোটদের নিয়ে লেখা গান, কবিতা, ছড়া, গল্প ও নাটক নিয়ে মালা গাথলেন গোবরডাঙ্গা কথাপ্রসঙ্গে’র নির্দেশক বিকাশ বিশ্বাস। তারই নির্দেশনায় তৈরী হলো নাটক ‘রবিমালা’ (রবীন্দ্র কোলাজ)।
২২ নভেম্বর শিল্পায়ন স্টুডিও থিয়েটারে নিজেদের উদ্যোগে মঞ্চস্থ করলেন তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রযোজনা ‘রবিমালা’। প্রথমে দুই মহান নাট্য ব্যক্তিত্ব সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও প্রসেনজীৎ বর্ধনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করেন উপস্থিত সকল নাট্যকর্মী ও দর্শক সাধারণ। এরপর নাটক শুরুর আগে গোবরডাঙ্গা শিল্পায়নের প্রধান আশিস চট্টোপাধ্যায় ও দলের পক্ষ থেকে রথীন্দ্রনাথ হালদার দর্শকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এই অতিমারির সময়ে অতিরিক্ত দর্শক সমাগমের কারণে।

নাটকের শুরু থেকেই ছিল চমকের পর চমক। একের পর এক গান, নাচ, কবিতা, নাটক এবং তাদের ঘাত-প্রতিঘাতে একত্ব হয়ে যায় অভিনেত্রী -অভিনেতা ও দর্শক। একাকার হয়ে যায় প্রণের রবি ঠাকুরের সাথে। ক্ষুদে দর্শকের সংখ্যা ছিল চখে পড়ার মতো। বড়দের সাথে তরাও অমল, পঞ্চক, সুধা’-কে চিনে নেবার চেষ্টা করলো তাদের মতো করে। সম্ভুর বীরত্বে লাফিয়ে উঠল যেমন তেমনই হারাধণের হাস চুরিতে হেসে লুটোপুটি, আবার কবিতার মধ্য দিয়ে তাদের মন ছুটলো অসীমের পানে। ভালো অভিনয়, গান, যন্ত্রসঙ্গিতের দোলায় ও দর্শকের উচ্ছাসে এক অপরূপ মুর্ছনা তৈরী হয় পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ।
পরিশেষে বলতেই হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু ছন্দপতন হয়েছে। এটি ছিল প্রথম অভিনয় তাই আশা করি আরও অনুশীলনে এ নাটক বাংলা থিয়েটারে একটা দাগ রেখে যাবে।
সঙ্গীতে ছিলেন মধুমিতা রায় বিশ্বাস ও মনামি রায়। যন্ত্রসঙ্গিতে জয়দীপ বিশ্বাস, রাকেশ ও দ্বীজেন, বিজয় প্রামাণিক। অভিনয়ে সাগরিকা হালদার, মুকুন্দ চক্রবর্তী, অসিত সরকার, রমেশ চন্দ্র দাস, জয়দীপ অধিকারী, অভিজিত কর্মকার, সুভজিত পাল, পৌলমী দেবনাথ, তিথি বিশ্বাস, পুজা, তুলি বসু প্রমুখ।
নির্দেশনা বিকাশ বিশ্বাস।
পূজার জন্য কি প্রয়োজন?
ধূপ? তাপ? মাল? ক্ষেত্রবিশেষে এই প্রয়োজনগুলোও বদলায় বৈকি! কেউ পূজা করেন ঢাক বাজিয়ে, মন্ত্র পড়ে। কেউ পীর-দরগায় মাথা কুটে। আবার কেউ ব্রিজের ওপর থেকে গঙ্গায় একটা কয়েন ফেলে মনে মনে চেয়ে নেন আগামীর সুখ। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, হ্যাঁ এইসব মানুষের মধ্যেও কিছু মানুষ আছেন যারা রঙিন মলাটের মধ্যেখানের সাদা-কালো দুনিয়ায় খুঁজে পান অন্তরের প্রশান্তি। আর এই সাদা পৃষ্ঠা-নদীর বুকে গাঢ় অক্ষরের নৌকায় চাপিয়ে যে মাঝি আমাদের বৈতরণী পার করিয়ে চলেছেন, তিনিই রবীন্দ্রনাথ। বয়সে, লিঙ্গে, স্বভাবে, প্রেমে, বিচ্ছেদে, জন্মে, খরায়,‌ বর্ষায়, শরতে, মৃত্যু-প্রজন্মে যে একটিমাত্র নাম ক্ষণে ক্ষণে বয়ে চলে উপশিরা বেয়ে, তিনিই রবীন্দ্রনাথ।
তাইতো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখলেন, “আজি এই বৈশাখের খরতপ্ত তেজে/পৃথিবী উন্মত্ত যবে তুমি এলে সেজে”।
কথা প্রসঙ্গে বলি, ‘কথাপ্রসঙ্গ’-এর কথা এখন প্রায়শই কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে! সেওতো এখন এক দামাল ছেলে! টগবগে তার রক্ত! এখন সে একুশের দোরগোড়ায়। এটাই তো সময় রবীন্দ্রনাথকে স্পর্শ করার স্পর্ধা দেখাবার। অচলায়তনের বন্ধ দরজা গুলি গানের চাবিতে খুলে দেবার।
‘কথাপ্রসঙ্গ’ নাট্যদল এই কাজটাই করেছে তাদের নবনাট্য ‘রবি মালা’ গড়তে গিয়ে। যেটা সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে তা হল এর বুনন। রবীন্দ্রনাথ আসলে এত বড় মহাসাগর, যার একটি দিক ছুঁতে গেলে অন্য দিক থেকে ঢেউ এসে ধাক্কা মারে। কিন্তু কী অপরিসীম দক্ষতায় নির্দেশক বিকাশ বিশ্বাস শুধু ছুঁয়েছেন তাই নয়,‌ বেশ খানিকটা ধরতেও পেরেছেন একাধিক রং। যার ফলে মালাটি হয়ে উঠেছে নিঃসন্দেহে বৈচিত্র্যময়। নাচ এবং গান অন্যতম দুটি স্তম্ভ এই নাটকের। নাচের দল যথাযথ ছিল। গানের বিষয় বলতে গিয়ে খানিকটা বেগ পেতে হয়। এই নাটকের সুরের আবেশ ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’! আর এই আবেশ গড়ার কারিগরদের একজন যখন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী তথা রবি পূজায় ডুবে থাকা গায়িকা মধুমিতা রায় বিশ্বাস। যার বাজনায় কান থেকে মস্তিষ্কের যাত্রাপথে কেবলই কামিনী ফুলের গন্ধ, এই অঞ্চলের তথা এই সময়ের অন্যতম সেরা সেতার বাদক জয়দীপ বিশ্বাস অনবদ্য। সর্বোপরি সুরের সঙ্গত প্রশংসনীয়। যে ফুলগুলি দিয়ে গাথা হলো এই মালা,‌ তাতে হাসির ঝলক, শক্তির ঝংকার, রাষ্ট্রের পরিহাস,‌ শেষ চিঠির অপেক্ষা সবই পাওয়া গেল যথোপযুক্ত পরিমাণে। পোশাক, আলো এবং অভিনয় বোধহয় এই নাটকের সেই সুতো যা রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন সৃষ্টির ফুল গুলির মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে কখন, কিভাবে তা টেরই পাওয়া গেল না! ফলে দলগত চর্চায় অভিভূত প্রায় সকলেই। সবকিছু মিলে মিশে যে মালা তৈরি হলো তা গন্ধ ছড়িয়েছে দর্শকের অনাবিল আনন্দে। তাই আনুমানিক এক ঘণ্টা সতেরো মিনিটের এই নাট্য-কোলাজে আট থেকে আশি সমস্ত দর্শকই কথাপ্রসঙ্গকে ফিরিয়ে দিয়েছেন তাদের প্রাণের উষ্ণতা। যা দিয়ে রোজ পূজা হয় একটিই ঠাকুরের…
“তুমি আমার পরশ-পাথর, মেঘ ছেঁড়া সোনা রোদ্দুর/ ওগো প্রিয় রবীন্দ্রনাথ তুমি আমার প্রাণের ঠাকুর।”

নজরে বাংলা
NAJORE BANGLA, founded over 5 years ago, consists of a growing population of professional business people, health-care providers, students, homemakers, labourers and entrepreneurs dedicated to the education and self enhancement for our youth and community. NAJORE BANGLA is a well known Bengali News and Entertainment Web Portal which has a wide-range readers throughout in all districts of West Bengal, Tripura, Assam and specially in Bangladesh. We have renowned journalists state-wide and in abroad are servicing through their profession. We promote positive lifestyles, focusing on children and families. Please send your feedback to najorebangladesk@gmail.com.
http://najore-bangla.com

Leave a Reply